২৫ বছর পর ৯/১১: নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন, শুক্রবার যেভাবে স্মরণ করবে আমেরিকা

শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক: ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে শুক্রবার। এক শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ পেরিয়ে গেলেও প্রায় ৩ হাজার মানুষের প্রাণহানি, হাজারো প্রথম সাড়াদানকারীর আত্মত্যাগ এবং হামলার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও সামাজিক প্রভাব আজও যুক্তরাষ্ট্রের স্মৃতিতে গভীরভাবে রয়ে গেছে। ২৫তম বার্ষিকীতে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ও পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলে দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হবে নিহতদের এবং সেই ভয়াবহ দিনের ঘটনাকে।

নিউইয়র্কে মূল স্মরণ অনুষ্ঠান

লোয়ার ম্যানহাটনের ৯/১১ মেমোরিয়াল প্লাজায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণে মূল স্মরণ অনুষ্ঠান শুরু হবে শুক্রবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে। অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যরা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা এবং ১৯৯৩ সালের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বোমা হামলায় নিহতদের নাম পাঠ করবেন।

অনুষ্ঠানে একাধিক নীরবতার মুহূর্ত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই টাওয়ারে বিমান আঘাতের সময়, দুই টাওয়ার ধসে পড়ার সময়, পেন্টাগনে হামলা এবং পেনসিলভানিয়ায় ফ্লাইট ৯৩ বিধ্বস্ত হওয়ার সময়। ৯/১১-সম্পর্কিত অসুস্থতায় পরবর্তী সময়ে যারা মারা গেছেন, তাদেরও স্মরণ করা হবে। প্রথম নীরবতা পালন করা হবে সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে। অনুষ্ঠানটি অনলাইনেও সম্প্রচার করা হবে।

নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্কের পরিবর্তে আর্লিংটনের পেন্টাগনে ৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী পালন করবেন।

৮টা ৪৬ মিনিটে প্রথম নীরবতা

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে ছিনতাই করা আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে। ওই সময়ই নিউইয়র্কের স্মরণ অনুষ্ঠানে প্রথম নীরবতা পালন করা হবে।

এরপর সকাল ৯টা ৩ মিনিটে সাউথ টাওয়ারে দ্বিতীয় বিমান আঘাতের ঘটনা, সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে সাউথ টাওয়ারের পতন এবং সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে নর্থ টাওয়ারের পতন স্মরণ করা হবে। একই সঙ্গে সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে পেন্টাগনে হামলা এবং সকাল ১০টা ৩ মিনিটে পেনসিলভানিয়ায় ফ্লাইট ৯৩ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাও স্মরণ করা হবে।

২০০১ সালের হামলায় নিউইয়র্কে ২,৭৫৩ জন, পেন্টাগনে ১৮৪ জন এবং ফ্লাইট ৯৩-এ ৪০ জন যাত্রী ও ক্রু নিহত হন। ৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম ২০০১ সালের হামলা এবং ১৯৯৩ সালের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বোমা হামলায় নিহত মোট ২,৯৮৩ জনকে স্মরণ করে।

৯/১১ জাদুঘরে নতুন প্রদর্শনী

২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্কের ন্যাশনাল সেপ্টেম্বর ১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম (National September 11 Memorial & Museum) চালু করছে নতুন প্রদর্শনী ‘তাঁদের সম্মানে: ৯/১১-পরবর্তী ২৫ বছরের সেবার গল্প’ (In Their Honor: 25 Years of 9/11-Inspired Service)। প্রদর্শনীটি ১২ সেপ্টেম্বর থেকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে। এতে ৯/১১-এর পর ব্যক্তি ও বিভিন্ন সম্প্রদায় কীভাবে শোককে জনসেবা, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার শক্তিতে রূপান্তর করেছে, সেই গল্প তুলে ধরা হবে।

জাদুঘরটি একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি ৩৫ মিনিটের ডিজিটাল লার্নিং এক্সপেরিয়েন্স (Digital Learning Experience) চালু করছে। এতে হামলা ও এর পরবর্তী সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত বক্তব্য এবং জাদুঘরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইন্টার‌্যাকটিভ আলোচনার সুযোগ থাকবে। অনুষ্ঠানটি ১১ সেপ্টেম্বর থেকে অনলাইনে চাহিদামতো দেখা যাবে।

জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, হামলার ২৫ বছর পর প্রায় ১০ কোটি আমেরিকান এমন একটি প্রজন্মের অংশ, যারা হামলার সময় জন্মায়নি অথবা তখন এত ছোট ছিল যে ঘটনাটি মনে রাখার মতো বয়স হয়নি। নতুন উদ্যোগগুলোর অন্যতম লক্ষ্য তাদের কাছে ৯/১১-এর ইতিহাস ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তুলে ধরা।

বিকেলে নিউইয়র্কে বিশেষ আয়োজন

স্মরণ কর্মসূচির পাশাপাশি শুক্রবার লোয়ার ম্যানহাটনে থাকছে আরও কয়েকটি বিশেষ আয়োজন। বিকেল ৩টায় সেন্ট নিকোলাস গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ অ্যান্ড ন্যাশনাল শ্রাইনে (St. Nicholas Greek Orthodox Church & National Shrine) অনুষ্ঠিত হবে আন্তঃধর্মীয় স্মরণসভা।

এরপর বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে পেরেলম্যান পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে (Perelman Performing Arts Center) ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ কনসার্টে অংশ নেবে নিউইয়র্ক ফিলহারমনিক (New York Philharmonic) ও ইউএস আর্মি ফিল্ড ব্যান্ড সোলজার্স’ কোরাস (U.S. Army Field Band Soldiers’ Chorus)। নিউইয়র্ক ফিলহারমনিকের নেতৃত্ব দেবেন আগত মিউজিক ডিরেক্টর গুস্তাভো দুদামেল (Gustavo Dudamel)।

পেন্টাগনে থাকবেন ট্রাম্প

ওয়াশিংটন এলাকার আর্লিংটনে ন্যাশনাল ৯/১১ পেন্টাগন মেমোরিয়ালে (National 9/11 Pentagon Memorial) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকীর স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। ২০০১ সালের হামলার তৃতীয় প্রধান লক্ষ্য ছিল পেন্টাগন। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনে আঘাত হানে। এতে বিমানের ৬৪ জন এবং পেন্টাগনের ১২৫ জনসহ মোট ১৮৪ জন নিহত হন।

পেনসিলভানিয়াতেও স্মরণ

পেনসিলভানিয়ার ফ্লাইট ৯৩ ন্যাশনাল মেমোরিয়ালে (Flight 93 National Memorial) শুক্রবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত থাকবে মূল স্মরণ অনুষ্ঠান। সেখানে ফ্লাইট ৯৩-এর ৪০ যাত্রী ও ক্রুর নাম পাঠ করা হবে এবং তাদের সম্মানে স্মরণঘণ্টা (Bells of Remembrance) বাজানো হবে। বিকেল ১টা থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত হবে দ্বিতীয় অনুষ্ঠান। এতে বক্তব্য, সংগীত পরিবেশনা এবং স্মৃতিসৌধের নেমস ওয়ালে (Wall of Names) পুষ্পস্তবক অর্পণ থাকবে।

রাতে নিউইয়র্কের আকাশে ‘ট্রিবিউট ইন লাইট’

দিনভর স্মরণ শেষে নিউইয়র্কের আকাশে আবারও জ্বলে উঠবে ঐতিহাসিক ‘ট্রিবিউট ইন লাইট (Tribute in Light)’—দুটি শক্তিশালী আলোর রশ্মি, যা ধ্বংস হয়ে যাওয়া টুইন টাওয়ারের প্রতীক হিসেবে প্রতিবছর ১১ সেপ্টেম্বর রাতে আকাশে দেখা যায়। ২৫তম বার্ষিকীতে এই আলোকস্মরণকে ঘিরে বিশেষ আয়োজনও থাকবে। দিনশেষে নিউইয়র্কের আকাশে জ্বলে ওঠা এই দুই আলোকরশ্মি আবারও স্মরণ করিয়ে দেবে ২০০১ সালের সেই ভয়াবহ দিনের কথা।

নিউইয়র্কের নতুন ‘স্মরণ ও সেবা দিবস’

২৫তম বার্ষিকীর আগে নিউইয়র্ক সিটি ১১ সেপ্টেম্বরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্মরণ ও সেবা দিবস (Day of Remembrance and Service)’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। শহরজুড়ে স্মরণসভা, শিক্ষামূলক কর্মসূচি, নীরবতা পালন এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি সেবা সচল রাখতে নগর প্রশাসন নতুন ‘কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও জরুরি সেবা নিশ্চিতকরণ দল (Continuity and Mission Assurance Team)’ গঠন করেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ নগরসেবা অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাই এই দলের প্রধান দায়িত্ব।

২৫ বছর পরও চলছে নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ

৯/১১-এর ২৫ বছর পরও নিউইয়র্কে হামলায় নিহতদের দেহাবশেষ শনাক্ত করার কাজ থেমে নেই। সম্প্রতি নিউইয়র্কের চিফ মেডিকেল এক্সামিনারের কার্যালয় (Office of the Chief Medical Examiner) এবং নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (NYPD) উন্নত ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটিভ জেনেটিক জিনিয়োলজি (forensic investigative genetic genealogy) প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও একজন নিহতের পরিচয় শনাক্ত করেছে।পরিবারের অনুরোধে ওই নারীর নাম প্রকাশ করা হয়নি। নতুন শনাক্তকরণের ফলে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হামলায় শনাক্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৬৫৪ জনে। তবে প্রায় ১,১০০ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।

এই প্রযুক্তিতে উন্নত ডিএনএ বিশ্লেষণের সঙ্গে বংশগত তথ্য ও পারিবারিক সম্পর্কের তথ্য মিলিয়ে অজ্ঞাত দেহাবশেষের পরিচয় খুঁজে বের করা হয়। নিউইয়র্কের চিকিৎসা পরীক্ষকের কার্যালয় এখনও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষ নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৫ বছর পরও এই শনাক্তকরণ প্রচেষ্টা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নয়—পরিবারগুলোর কাছে এটি প্রিয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটানোর একটি মানবিক প্রতিশ্রুতি।

২৫ বছর পরও শেষ হয়নি স্মরণ

২৫ বছর পরও ৯/১১ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়—এটি নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং পুরো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে যাওয়া একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি।এবারের স্মরণ তাই শুধু নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রথম সাড়াদানকারী, উদ্ধারকর্মী, ৯/১১-পরবর্তী অসুস্থতায় আক্রান্ত ও নিহত মানুষ, স্বজন হারানো পরিবার এবং হামলার পর জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম—সবাইকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে ২৫তম বার্ষিকীর কর্মসূচি। এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পরও আমেরিকার বার্তা একই—‘কখনো ভুলে যাব না’ (Never Forget)।