মায়ানমারের দাওয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে রাশিয়ার বড় বিনিয়োগের উদ্যোগ

শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক: মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা দাওয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করতে রাশিয়া সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসেছে। প্রকল্পটিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং অংশীদারত্বের বিষয়ে মস্কো ও নেপিডোর মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়েছে।

দাওয়ে প্রকল্পের আওতায় গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার এবং বিভিন্ন শিল্প স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন বাণিজ্যিক ও শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সম্প্রতি রাশিয়া ও মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের মধ্যে দাওয়ে প্রকল্প নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। রুশ বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার সময়কালে বড় অংশীদারত্ব চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। দাওয়ে এলাকায় ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া তেল শোধনাগারসহ শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রুশ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এসব প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের আলোচনা চলছে। গত আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং রাশিয়া সফর করেন। মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এর পরপরই দাওয়ে প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

আন্দামান সাগরের তীরে তানিনথারি অঞ্চলে দাওয়ের অবস্থান। ভৌগোলিক কারণে প্রকল্পটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দাওয়ে থেকে থাইল্যান্ডের শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দাওয়ে বন্দর চালু হলে পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহনে একটি বিকল্প পথ তৈরি হতে পারে। এর ফলে মালাক্কা প্রণালীনির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। এদিকে দাওয়ে অঞ্চলকে ঘিরে মিয়ানমারের সামরিক তৎপরতাও সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্প এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি প্রস্তুতের লক্ষ্যে সামরিক বাহিনী সেখানে অভিযান জোরদার করেছে। স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে।

দাওয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের ধারণা নতুন নয়। থাইল্যান্ডের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কয়েক বছর আগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থায়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কাজ এগোয়নি। বর্তমানে রাশিয়ার আগ্রহের কারণে প্রকল্পটি আবারও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। দাওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মিয়ানমারের বাণিজ্যিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্দামান সাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাও আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।