রোহিঙ্গা সংকট: ত্রাণ নয়, এবার সমাধানের কূটনীতি

সম্পাদকীয়ঃ

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল একটি মানবিক বিপর্যয়ের নাম নয়। এটি ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বছরের পর বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, তার স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মহলে রয়েছে। কিন্তু একটি অস্থায়ী মানবিক ব্যবস্থা যখন দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন তার সঙ্গে নতুন নতুন ঝুঁকিও তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আর কতদিন বাংলাদেশ শুধু আশ্রয় ও ত্রাণ দিয়ে যাবে?

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু এসব মানবিক সহায়তা সংকটের মূল কারণের সমাধান নয়। রোহিঙ্গারা কেন নিজেদের দেশে ফিরতে পারছে না, কেন প্রত্যাবাসন বারবার অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ কেন তৈরি হচ্ছে না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের কারণে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় জনসংখ্যার ওপর চাপ বেড়েছে। স্থানীয় অবকাঠামো, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। বিপুলসংখ্যক মানুষের দীর্ঘদিনের অবস্থান স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পদ ও সুযোগ নিয়ে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। ফলে মানবিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অপরাধী চক্র, মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, অস্ত্রের অবৈধ প্রবাহ এবং বিভিন্ন ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না—এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। অধিকাংশ রোহিঙ্গাই নিরাপদ জীবন, মৌলিক অধিকার এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ চায়। কিন্তু শিবিরের অনিরাপদ পরিবেশে অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়লে তা শরণার্থীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অস্থিরতা। সেখানে সংঘাত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন করে মানুষের ঢল নামার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই চাপ বহন করা বাস্তবসম্মত নয়।

তবে সমাধানের পথও সহজ নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ এই সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থও জড়িত। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও বহুমাত্রিক করতে হবে।

প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট আন্তর্জাতিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানো হবে—এমন সাধারণ প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে প্রত্যাবাসনের সময়সূচি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নাগরিক অধিকার, বসবাসের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কাঠামো নিয়ে কার্যকর আলোচনা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াতে হবে। জাতিসংঘ, আঞ্চলিক জোট এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। যেসব দেশ মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা দরকার।

তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনকে শুধু সংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখলে চলবে না। কতজন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হলো—এটি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। তারা নিরাপদে ফিরতে পারছে কি না, তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কি না এবং আবারও তাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ নিরাপত্তাহীন প্রত্যাবাসন কোনো সমাধান নয়; সেটি নতুন সংকটের সূচনা করতে পারে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, শিবিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শক্তিশালী করা, মানবপাচার ও মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ রোহিঙ্গাদের যেন নিরাপত্তা ব্যবস্থার নামে অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে একটি ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার রক্ষা এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা—এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং কার্যকর মানবিক ব্যবস্থাপনা নিজেই নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে পারে।

শিক্ষা ও কর্মদক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও এই সংকট মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম যদি শিক্ষা ও ভবিষ্যতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে হতাশা ও অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তার আওতায় শিশু ও তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও উপেক্ষা করা যাবে না। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কক্সবাজার ও আশপাশের স্থানীয় জনগণের জন্যও উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষ যদি মনে করেন যে শরণার্থী সংকটের কারণে তারাই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাহলে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এ কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—ত্রাণের অর্থ দিয়ে সমস্যাকে টিকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু সমাধান করা যায় না।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিপুল মানবিক ও অর্থনৈতিক বোঝা বহন করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সত্যিই বাংলাদেশের পাশে থাকতে চায়, তাহলে তাদের এখন আরও কার্যকর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা নিতে হবে। শুধু সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ বা তহবিল সংগ্রহ যথেষ্ট নয়; প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

বাংলাদেশের নিজেদের কূটনীতিতেও এখন নতুন মাত্রা প্রয়োজন। আবেগ ও মানবিক আবেদন গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু তার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক কূটনীতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং একাধিক দেশের সঙ্গে সমন্বিত কৌশল।

বাংলাদেশকে একই সঙ্গে তিনটি লক্ষ্য সামনে রাখতে হবে—রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার রক্ষা, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি।

এই তিনটি লক্ষ্য একে অপরের বিরোধী নয়। বরং একটি টেকসই সমাধানের জন্য তিনটিই অপরিহার্য।

রোহিঙ্গা সংকটকে আর সাময়িক শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখার সময় নেই। এটি এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংকট। আজ যদি এর রাজনৈতিক সমাধানের ভিত্তি তৈরি করা না যায়, তাহলে আগামী দিনে এর মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্য আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সময় এসেছে কূটনীতির পরবর্তী ধাপে যাওয়ার। ত্রাণ অবশ্যই চলবে, মানবিক সহায়তাও চলবে; কিন্তু এর পাশাপাশি সমাধানের জন্য আরও কঠোর, সুসংগঠিত ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।

কারণ বাংলাদেশ চিরকাল একটি সংকটের ব্যবস্থাপনা করতে পারে না। তাকে এই সংকটের সমাধান চাইতে হবে।

আর সেই সমাধানের প্রথম শর্ত হলো—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরি করা।

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ শুধু কক্সবাজারের শিবিরে নির্ধারিত হবে না; এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে। এখন প্রশ্ন হলো—সেই টেবিলে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, কতটা সক্রিয় এবং কতটা দৃঢ়?