অপরাধ দমনে ফের যৌথ অভিযানের আলোচনা, সমন্বিত অভিযানে জোর!

ঢাকা: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, ছিনতাই, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপের আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে যৌথ বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হলেও, এখন পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে নতুন কোনো বিশেষ অভিযানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং পুলিশ, বিজিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও আনসারসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদারের কথা জানিয়েছে সরকার।

২৯ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমানে পুলিশ তাদের তৎপরতা বাড়াচ্ছে। তবে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী নামানো হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অপরাধ কমেছে, আবার কিছু অপরাধ বেড়েছেও।

এর দুই দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেন, ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা নেই। তবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, জমি ও ফুটপাত দখল, ছিনতাই এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে।

দৈনিক ইনকিলাবের ১ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাজধানীতে জমি দখল, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৫৩৬ জনের একটি তালিকা রয়েছে। প্রতিবেদনে ১ হাজার ২৫২ জনকে মাঠপর্যায়ের সক্রিয় চাঁদাবাজ এবং ২৭৮ জনকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে একই প্রতিবেদনে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, ডিএমপির বরাতে প্রকাশিত ওই তালিকা সম্পর্কে তার জানা নেই এবং ডিএমপি এ ধরনের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তিনি জানান, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও অন্যান্য সংস্থার কাছে অপরাধীদের আলাদা তালিকা থাকতে পারে।

এ কারণে ১ হাজার ৫৩৬ জনের সংখ্যাটিকে ডিএমপির আনুষ্ঠানিক ও যাচাইকৃত তালিকা হিসেবে উপস্থাপন না করে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত দাবি হিসেবে দেখা প্রয়োজন। দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিবেদনে ডিএমপির সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজির ঘটনায় ৫০৬টি মামলা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৪৮, ফেব্রুয়ারিতে ৪১, মার্চে ৫৮, এপ্রিলে ৭১, মে মাসে ৬৫, জুনে ৪৭, জুলাইয়ে ৪৯, আগস্টে ৬৭ এবং সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখ পর্যন্ত ৫৯টি মামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাইসংক্রান্ত ৭০৩টি মামলা হয়েছে এবং এসব মামলায় ১ হাজার ৮৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর ৫৩১টি মামলায় ১ হাজার ৪৩৫ জন এবং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৭২টি মামলায় ৪০২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব পরিসংখ্যান থেকে রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রমের একটি চিত্র পাওয়া যায়। তবে মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা নিজে থেকে কোনো ব্যক্তির অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন অর্থ বহন করে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাস থেকে সারাদেশে বিশেষ অভিযান চলছে। এ সময়ে কয়েক হাজার অপরাধী গ্রেপ্তার এবং আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। তবে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় অভিযান আরও জোরদারের কথা বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, অপরাধীদের ক্ষেত্রে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সরকারের পক্ষ থেকে এমন অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে।

রাজধানীর চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের নেটওয়ার্ক নিয়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতা-কর্মীদের নাম থাকার দাবি করা হয়েছে। বিবিসি বাংলার ২৮ সেপ্টেম্বরের পত্রিকা পর্যালোচনায় বলা হয়, নিউ এজ-এর প্রতিবেদনে ডিএমপির একটি তালিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি-সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৫৩০ জনের নাম থাকার দাবি করা হয়। সেখানে ২৭৮ জনকে অপরাধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ২৩০ জন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বর্তমান বা সাবেক নেতা-কর্মী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের ১ হাজার ২৫২ জনের মধ্যে অন্তত ৩৫০ জন বিএনপি বা সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলেও দাবি করা হয়েছে।

তবে এই দাবির ক্ষেত্রে ডিএমপির পক্ষ থেকে সরাসরি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে রাজনৈতিক পরিচয়-সংক্রান্ত এসব তথ্যকে পুলিশের চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধের তালিকা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে যৌথ বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি এখন সরকারের প্রকাশ্য আলোচনায় এসেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ তাদের তৎপরতা বাড়াচ্ছে। তবে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজনে যৌথ বাহিনী নামানো হতে পারে। এরপর ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেই। তবে পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও আনসারের সমন্বিত কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চলছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তা আরও জোরদার করা হবে।

২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যৌথ অভিযানের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি; আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট ফিরছে’—এমন নিশ্চিত ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে অপরাধ দমনে সমন্বিত ও প্রয়োজনে যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম জোরদারের আলোচনা চলছে—এই ভাষ্যটি সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চাঁদাবাজ ও অপরাধীদের তালিকা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের নিজস্ব তথ্যভান্ডার থাকার কথা বলা হলেও সব তালিকা প্রকাশ্য নয়। ডিএমপির কর্মকর্তা মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, ডিএমপির কেন্দ্রীয়ভাবে এমন তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, গোয়েন্দা শাখা এবং অন্যান্য সংস্থার কাছে অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য থাকতে পারে। তিনি বলেন, মামলা, মামলার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে।

এদিকে এসআরবির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে তাদের নিজস্ব তালিকা রয়েছে। চলমান বিশেষ অভিযানে তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

২০০২ সালের অপারেশন ক্লিন হার্ট ছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে পরিচালিত একটি বড় যৌথ অভিযান। ১৬ অক্টোবর ২০০২ থেকে ৯ জানুয়ারি ২০০৩ পর্যন্ত চলা ওই অভিযানে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী অংশ নেয়। পরবর্তীতে অভিযান চলাকালে গ্রেপ্তার, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

২০১৫ সালে হাইকোর্ট যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩-কে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে অপারেশন ক্লিন হার্টের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনায় ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকারের পথ পুনরায় উন্মুক্ত হয়।

এই অতীত অভিজ্ঞতার কারণে বর্তমান সময়ে ‘যৌথ অভিযান’ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই অপারেশন ক্লিন হার্টের প্রসঙ্গ সামনে আসছে। তবে বর্তমান সরকারের ঘোষিত অবস্থান এখন পর্যন্ত আগের সেই নামে বা একই কাঠামোয় অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্তের কথা বলছে না; বরং সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম জোরদারের কথা বলা হচ্ছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, ছিনতাই, মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের ওপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার চাপ রয়েছে। ইতোমধ্যে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান চলছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে যৌথ বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনার কথাও সরকারের একজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।

তবে ২ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান অনুযায়ী, ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে নতুন কোনো অভিযান শুরু করার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান পরিকল্পনা হিসেবে সামনে রয়েছে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা আরও জোরদার করা এবং প্রয়োজন হলে যৌথ বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যে পদক্ষেপই নেওয়া হোক, তার কার্যকারিতার পাশাপাশি গ্রেপ্তার ও অভিযানের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। বিশেষ করে অপারেশন ক্লিন হার্টের অভিজ্ঞতার পর নতুন কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান হলে তার আইনি কাঠামো, ক্ষমতার সীমা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা নিয়ে জনপরিসরে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।