লন্ডন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক আটক, মানবাধিকার এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়গুলোতে পশ্চিমা সরকারগুলোকে প্রকাশ্যে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর লন্ডনের ওয়ান গ্রেট জর্জ স্ট্রিটে আয়োজিত একটি সেমিনারে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বক্তব্য দেন জয়। ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র, অধিকার ও আইনের শাসন সুরক্ষা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স।
বক্তব্যে জয় অভিযোগ করেন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশে কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো উপেক্ষা করছে। তিনি দাবি করেন, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় ধরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা করেন জয়।২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক ছিল। কমনওয়েলথের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে একই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে উদ্বেগ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জানায়, আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত অনেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ইচ্ছামতো এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকারের সময় ব্যাপকভাবে আলোচিত জোরপূর্বক গুমের মতো কিছু দমনমূলক কর্মকাণ্ড পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে সংঘটিত সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনাতেও জয় সেনাবাহিনীকে দায়ী করেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল। তবে ওই সময় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার পর তাদের সদস্যরা হামলার মুখে পড়েন এবং আত্মরক্ষার্থে তারা ব্যবস্থা নেন। ফলে নিহতদের বিষয়ে ঘটনাপ্রবাহ ও দায়-দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশের বিমান কেনা এবং আমদানি করা গ্যাসের মূল্য পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কার্যত থেমে গেছে। তবে বিদ্যমান অর্থনৈতিক তথ্য পরিস্থিতির একটি আরও মিশ্র চিত্র তুলে ধরে।
২৩ সেপ্টেম্বর বোয়িং জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি উড়োজাহাজের অর্ডার দিয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালে বিমানের মোট অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫টি। তবে এই ঘোষণা থেকে বাংলাদেশ কোনো চুক্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে কি না বা ভবিষ্যতের সব আর্থিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
একইভাবে, প্রকাশিত বিনিয়োগের তথ্যও দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবিকে সমর্থন করে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জানুয়ারি ২০২৬-এর অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়ায়। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যেই রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে। ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ।
বক্তব্যের শেষ দিকে জয় বাংলাদেশে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন। বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিজ নিজ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো তাদের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।