শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: ইরানের বিমান চলাচল খাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ২৭টি বিমান সংস্থাসহ মোট ৩৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের এক ঘোষণায় বলা হয়, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের বিমান চলাচল, বিমান সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বাড়াতেই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের জন্য বিমান, বিমান প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সংবেদনশীল সরঞ্জাম সংগ্রহ ও স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, জনবল ও অবৈধ পণ্য পরিবহনে ইরানের বিমান চলাচল নেটওয়ার্ককে সহায়তার অভিযোগও আনা হয়েছে।
২৭ ইরানি বিমান সংস্থা নিষেধাজ্ঞার আওতায়
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (ওএফএসি) ইরানের বিমান চলাচল খাতে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ২৭টি ইরানি বিমান সংস্থাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়ার শিরাজ, আসা জেট এয়ারলাইন, আতা এয়ারলাইন্স, অ্যাটলাস এভিয়েশন গ্রুপ, আভা এয়ারলাইন্স, চাবাহার এয়ারলাইন্স, ফ্লাই কিশ এয়ারলাইন্স, ইরান এয়ার ট্যুর, ইরান আসেমান এয়ারলাইন্স, কিশ এয়ারলাইন্স, কারুন এয়ারলাইন্স, কেশম এয়ার, সাহা এয়ারলাইন্স, সেপেহরান এয়ারলাইন্স, তাবান এয়ারলাইন্স, ভারেশ এয়ারলাইন্স ও জাগরোস এয়ারলাইন্সসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ইরানের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল খাতের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ।
মাহান এয়ারের সহায়ক নেটওয়ার্কও লক্ষ্যবস্তু
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি বিমান সংস্থা মাহান এয়ারকে সহায়তার অভিযোগে কয়েকটি তৃতীয় দেশের কোম্পানি ও ব্যক্তিকেও নতুন করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মাহান এয়ারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বা মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন বিমান স্থানান্তরে ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত তিনটি বোয়িং ৭৭৭ বিমান মাহান এয়ারের কাছে স্থানান্তর করা হয়। এ নেটওয়ার্কে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিমান চলাচল সংক্রান্ত কিছু অনুমোদন স্থগিত
নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইরান-সংক্রান্ত বিমান চলাচলের জন্য আগে দেওয়া তিনটি অনুমোদনও স্থগিত করেছে ওএফএসি। এসব অনুমোদনের আওতায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার এবং অ-মার্কিন বিমান সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মার্কিন উৎপাদিত বা নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক বিমান ইরানে পরিচালনার সুযোগ ছিল। তবে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পৃথকভাবে বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (ফিনসেন) আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক সতর্কতাও জারি করেছে। এতে ইরানের বিমান ও বিমানযন্ত্রাংশ সংগ্রহের প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের দাবি, ইরান ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মধ্যস্থতাকারী ও আড়াল কোম্পানি ব্যবহার করে বিমান, যন্ত্রাংশ এবং দ্বৈত ব্যবহারের প্রযুক্তি সংগ্রহের চেষ্টা করে আসছে।
‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অংশ
সর্বশেষ এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অংশ। গত আগস্টে ঘোষিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য ইরানি সরকারের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক নেটওয়ার্ক ও রাজস্ব প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করা। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ থাকবে। সাধারণভাবে মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক বা আর্থিক লেনদেন করতে পারবে না।
এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য লেনদেন করলে বিদেশি কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে ইরানের বিমান চলাচল খাতকে আরও বিচ্ছিন্ন করা।