জাতিসংঘ সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিলেন খলিলুর রহমান

শিব্বীর আহমেদ, জাতিসংঘ, নিউইয়র্ক: সংলাপ, সহযোগিতা, আস্থা পুনর্গঠন এবং অর্থবহ সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৮১তম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সূচনার আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা নজিরবিহীন চাপ ও আস্থার সংকটের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মতপার্থক্যের মধ্যেও অভিন্ন স্বার্থ খুঁজে বের করে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২ জুন ২০২৬ সাধারণ পরিষদে নির্বাচিত হয়ে খলিলুর রহমান ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। আগামী এক বছর তিনি ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।

খলিলুর রহমান বলেন, বিশ্বের অনেক বিরোধ দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সে কারণে দেশগুলোর মধ্যে যেখানে অভিন্ন স্বার্থ ও সমঝোতার সুযোগ রয়েছে, সেখানে কাজের চেষ্টা থেমে থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, তাঁর সভাপতিত্ব জাতিসংঘ সনদ এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দেওয়া দায়িত্বের ওপর দৃঢ়ভাবে ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেবেন।

জাতিসংঘ সংস্কারে জোর

জাতিসংঘের অর্থবহ সংস্কারকে নিজের অগ্রাধিকারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন খলিলুর রহমান। তাঁর মতে, বিশ্ব সংস্থাটিকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও সক্ষম করে তুলতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতি মানুষের আস্থা এখন ঘাটতির মুখে। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু বর্তমান সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও উপযোগী করে তুলতে হবে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের জন্য তাঁর ঘোষিত বৃহত্তর কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি, জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষা, মানবাধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কার। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সংস্কার প্রচেষ্টার প্রতিও সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন।

সরকারগুলোর বাইরেও কণ্ঠস্বর

জাতিসংঘের কার্যক্রমে সরকারগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ, শিল্প ও উদ্ভাবন খাতের প্রতিনিধিদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ সনদের শুরুতে থাকা ‘আমরা জাতিসংঘের জনগণ’—এই ধারণার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, জাতিসংঘ শুধু সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিষ্ঠান নয়। বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষের মতামত ও অংশগ্রহণের আরও সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁর সভাপতিত্বের মূল দর্শন ‘আস্থা পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা’ হলেও এর সঙ্গে তিনি জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যও যুক্ত করেছেন।

রোহিঙ্গাদের কণ্ঠ তুলে ধরার অঙ্গীকার

রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ সনদে ‘জাতিসংঘের জনগণ’-এর যে ধারণা রয়েছে, তা জাতীয়তা বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা বিষয়ক সাবেক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তিনি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ তাদের কণ্ঠ জাতিসংঘের সামনে তুলে ধরেছে এবং তিনি ভবিষ্যতেও সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।

উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে সংলাপের প্রত্যাশা

সেপ্টেম্বরের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বের নেতাদের উপস্থিতিকে সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ সময়ে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বক্তব্য দেবেন।

খলিলুর রহমান আশা প্রকাশ করেন, বিশ্বনেতারা তাঁদের বক্তব্যে বিরোধ ও সংকট সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরবেন এবং উন্নয়ন, মানবকল্যাণ ও মানবাধিকারের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করবেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের নেতাদের অগ্রাধিকারগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোর মধ্যে অভিন্ন বিষয় চিহ্নিত করার চেষ্টা করবে সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়।

‘আমি সব দেশের সভাপতি’

নিজের ভূমিকা সম্পর্কে খলিলুর রহমান বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা নির্বাচনে তাঁকে সমর্থনকারী দেশগুলোর জন্য নয়, সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য কাজ করবেন। জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তিনি সনদ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা জানান। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থী সুপারিশ করে এবং সাধারণ পরিষদ তাঁকে নিয়োগ দেয়। খলিলুর রহমান বলেন, এই প্রক্রিয়ায় তিনি সদস্যরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন।

৮ সেপ্টেম্বর ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তির পর ৮১তম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের এই অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুরু হয়ে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৭ শেষ হবে।

বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৮৬-৮৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। চার দশক পর আবারও বাংলাদেশ থেকে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন খলিলুর রহমান।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে তাঁর সভাপতিত্বের মূল লক্ষ্য হিসেবে তাই উঠে আসছে—বিভক্ত বিশ্বের মধ্যে সংলাপ বাড়ানো, আস্থা পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করে তোলা।