হাম ও ডেঙ্গুর দ্বৈত আঘাত: হাসপাতাল কি প্রস্তুত, স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি জাগবে?

সম্পাদকীয়:

বাংলাদেশ আবারও জনস্বাস্থ্যের এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। একদিকে হাম ছড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগজনকভাবে, অন্যদিকে ডেঙ্গুও বাড়ছে দ্রুত। দুটি রোগের চরিত্র আলাদা, সংক্রমণের পথ আলাদা, প্রতিরোধের কৌশলও আলাদা। কিন্তু দুটির অভিঘাত এসে পড়ছে একই জায়গায়—মানুষের জীবন, পরিবারের অর্থনীতি এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাম এমন একটি রোগ যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা বহু বছর ধরেই রয়েছে। অথচ টিকাদানের ঘাটতি, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিচ্ছিন্নতা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবের কারণে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ যখন বড় আকারের প্রাদুর্ভাব তৈরি করে, তখন সেটি শুধু একটি স্বাস্থ্যসংকট থাকে না; এটি হয়ে ওঠে আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রশ্ন।

অন্যদিকে ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো সংকট নয়। প্রতিবছর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এই রোগের প্রকোপ বাড়ে। ফলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের অভিজ্ঞতা, পূর্বাভাস এবং প্রস্তুতি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে যখন হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি প্রতিবছর একই সংকটের পুনরাবৃত্তি দেখছি, নাকি আগের অভিজ্ঞতা থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নিচ্ছি?

হাম ও ডেঙ্গুর এই যুগপৎ চাপের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। হাম শিশুদের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রেও দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। যখন একই সময়ে দুই রোগের প্রকোপ বাড়ে, তখন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, শয্যা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ওপর চাপও বেড়ে যায়।

এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমাদের হাসপাতালগুলো কি প্রস্তুত?

শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। হাসপাতাল হলো সংকট মোকাবিলার শেষ ধাপ। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি হলো রোগকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যতটা সম্ভব প্রতিরোধ করা।

হামের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করা, যেসব শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে তাদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করা। শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের কাছেও টিকা পৌঁছাতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আবার লড়াইটি শুরু করতে হবে হাসপাতালের বাইরে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রম ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। শুধু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।

এখানে নগর ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ছাদ, ড্রেন, জমে থাকা পানি—এসব জায়গায় এডিস মশার প্রজনন বন্ধে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান প্রয়োজন। তবে অভিযান যেন শুধু সংবাদ সম্মেলন বা কয়েক দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য। কোন এলাকায় কতজন হাম বা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, কোথায় রোগের বিস্তার বেশি, কোন বয়সের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা গেলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আগেই ব্যবস্থা নিতে পারে। আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং রোগের বিস্তার অনুমান করে আগেই প্রস্তুতি নেওয়াই সাফল্যের মাপকাঠি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে যে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব, সেই রোগে শিশুর মৃত্যু হলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব নিয়ে আরও কঠিন প্রশ্ন তোলা জরুরি।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ বরাদ্দই সবকিছু নয়। সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে তার ফল কতটা পৌঁছাচ্ছে এবং সংকটের সময় ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হচ্ছে—এসব বিষয়েও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। অভিভাবকদের শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, শরীরে র‍্যাশ বা ডেঙ্গুর সম্ভাব্য উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। নিজের বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়েও নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলার আগে রাষ্ট্রকেও নাগরিকদের প্রয়োজনীয় তথ্য, সেবা ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বৈত সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আজকের প্রশ্ন শুধু কতজন আক্রান্ত হয়েছেন বা কতটি হাসপাতাল শয্যা খালি আছে—তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি, যা মহামারি বা রোগের বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করতে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী দেয়ালটি তৈরি থাকে।

হাম আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—টিকাদানে কোনো শূন্যতা নিরাপদ নয়।
ডেঙ্গু মনে করিয়ে দিচ্ছে—জনস্বাস্থ্যের লড়াই হাসপাতালের ভেতরে নয়, শুরু হয় ঘর, রাস্তা ও নগর ব্যবস্থাপনা থেকে।

এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রয়োজন তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ। কারণ আজকের এই দ্বৈত সংকট যদি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ হয়ে ওঠে, তবেই এই মৃত্যুগুলো থেকে আমরা একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে পারব।

প্রশ্ন তাই শুধু হাসপাতাল প্রস্তুত কি না—প্রশ্ন হলো, আমাদের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি প্রস্তুত?