প্রবাসী আয় বাড়ছে, কিন্তু প্রবাসীরা কি যথাযথ সেবা পাচ্ছেন?

অরপি আহমেদঃ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। প্রতি বছর লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি নিজেদের পরিবার, স্বজন এবং দেশের অর্থনীতির জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠাচ্ছেন। এই অর্থ শুধু পরিবারের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখছে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহের চিত্র তুলে ধরছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ১৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে এই সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছেন বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি। সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। মার্চ-আগস্ট সময়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এসেছে প্রায় ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।

প্রশ্ন হলো—দেশের জন্য যারা এত বড় অবদান রাখছেন, রাষ্ট্র তাদের জন্য কতটা সহজ, দ্রুত ও সম্মানজনক সেবা নিশ্চিত করতে পারছে? এই প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রবাসীদের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, নথি সত্যায়নসহ নানা কাজে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিদেশে বসে বাংলাদেশের সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি ছোট জটিলতাও অনেক সময় প্রবাসীর জন্য বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার অবশ্য এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যেসব বাংলাদেশি মিশনে ই-পাসপোর্ট সেবা চালু হয়েছে, সেখানে অনলাইনে আবেদন, সুবিধাজনক সময়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন এবং আবেদনের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা রয়েছে। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাস্তবতার জায়গাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ১৭টি দেশের ২৭টি বাংলাদেশ মিশনে এনআইডি সেবা চালু হয়েছে। সরকার ধীরে ধীরে ৪১টি দেশে এই সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ এখনও বিশ্বের অনেক দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য এনআইডি-সংক্রান্ত সেবা সরাসরি সহজলভ্য নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণই ধরা যাক। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ওয়েবসাইটে ই-পাসপোর্টের জন্য অনলাইন আবেদন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে। এনআইডির জন্যও আবেদন ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রক্রিয়া নির্ধারিত আছে। তবে নতুন এনআইডি আবেদন গ্রহণ করা হলেও সংশোধনের আবেদন কনস্যুলেটে প্রক্রিয়াকরণ করা হয় না—এমন তথ্যও কনস্যুলেটের ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে—সেবা চালু করা এবং সেবা সহজ করা কি একই বিষয়? একজন প্রবাসীকে যদি একটি সাধারণ নথির জন্য বারবার দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যেতে হয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, অথবা বাংলাদেশের কোনো দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে অনলাইন সেবা চালুর সুফল কতটা বাস্তবায়িত হলো?

প্রবাসীদের জন্য কনস্যুলার সেবাকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। একজন প্রবাসী যখন বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন এবং নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, তখন তার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে, এনআইডিতে ভুল থাকলে, জন্মনিবন্ধন বা অন্য কোনো নথি প্রয়োজন হলে কিংবা কোনো আইনি জটিলতায় পড়লে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়াও তার অধিকার।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীদের সেবা শুধু রাজধানী বা বড় শহরের দূতাবাসকেন্দ্রিক হলে চলবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প একটি কার্যকর উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এমন সেবা আরও নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে আয়োজন করা গেলে বহু প্রবাসী দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে দূতাবাসে যাওয়ার ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারেন। ফ্লোরিডার বাংলাদেশ কনস্যুলেটও নিয়মিত কনস্যুলার ট্যুরের নোটিশ প্রকাশ করছে।

একই সঙ্গে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর করতে হবে। সরকার জানিয়েছে, প্রতিটি বাংলাদেশ মিশনে অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। প্রবাসীকে শুধু রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক, একজন বিনিয়োগকারী, একজন পরিবারের সদস্য এবং দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ দূত। প্রবাসী আয় বাড়ছে—এটি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রবাসীদের সেবার মানও বাড়ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখতে হলে প্রবাসীদের আস্থা ধরে রাখতে হবে। আর আস্থা তৈরি হয় শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনায় নয়; দ্রুত সেবা, স্বচ্ছতা, সম্মান এবং জবাবদিহির মাধ্যমে। দেশ যখন প্রবাসীদের কাছ থেকে আরও বেশি অবদান আশা করছে, তখন রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব হবে প্রবাসীদের জন্য আরও ভালো সেবা নিশ্চিত করা। প্রবাসীর অর্থ যেমন দেশের সম্পদ, তেমনি প্রবাসীর আস্থাও দেশের সম্পদ। সেই আস্থা রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

– কলামিস্ট, এলমহার্স্ট, নিউ ইয়র্ক।