গণতন্ত্র ও জবাবদিহি: সংসদীয় কমিটি দুর্বল হলে জবাবদিহি কোথায়?

সম্পাদকীয়ঃ

গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন, ভোটাধিকার কিংবা সরকার গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর। আর এই জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও সংসদীয় মাধ্যম হলো সংসদীয় কমিটি।

সরকার পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সংসদের ভূমিকা থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে যদি সংসদীয় কমিটিগুলো তাদের দায়িত্ব স্বাধীনভাবে ও কার্যকরভাবে পালন করতে না পারে, তাহলে সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর সংসদীয় নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—সংসদীয় কমিটি দুর্বল হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?

সংসদীয় কমিটির কাজ কেবল বৈঠক করা কিংবা সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের ডেকে বক্তব্য শোনা নয়। এসব কমিটির দায়িত্ব হলো সরকারি সিদ্ধান্ত, নীতি, ব্যয়, প্রকল্প ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা এবং অনিয়ম বা ব্যর্থতা চিহ্নিত হলে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা। অর্থাৎ সংসদীয় কমিটি কার্যকর থাকলে নির্বাহী বিভাগের ওপর একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।

গণতন্ত্রে সরকারের হাতে বিপুল ক্ষমতা থাকে। সেই ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, জনগণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্ব পালন করছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই সংসদীয় নজরদারির অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু কমিটির কার্যক্রম যদি রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্য কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে সেই নজরদারি তার কার্যকারিতা হারায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি প্রয়োজন। কোনো কমিটি যদি অনিয়ম চিহ্নিত করে, সুপারিশ দেয়, কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তা উপেক্ষা করে—তাহলে সেই সুপারিশের পরিণতি কী? কতগুলো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, কতগুলো হয়নি এবং কেন হয়নি—এসব তথ্য জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত।

কারণ সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তর শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছেই জবাবদিহি করবে—এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শন।

একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটিকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে তা কেবল সরকারের আনুষ্ঠানিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়। কমিটির সদস্যদের পর্যাপ্ত তথ্য, নথি ও স্বাধীনভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ থাকতে হবে। প্রয়োজন হলে সরকারি কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

এখানে বিরোধী দলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল শুধু সরকারের সমালোচনা করবে—এমন নয়; সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা ও প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগও তাদের থাকতে হবে। কারণ শক্তিশালী বিরোধী মতামত সংসদীয় নজরদারিকে আরও কার্যকর করে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে।

তবে জবাবদিহি মানে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বিরোধিতার চোখে দেখা নয়। সংসদীয় কমিটির কাজ হওয়া উচিত তথ্য, নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা। সরকার ভালো কাজ করলে তার স্বীকৃতি দিতে হবে, আবার অনিয়ম হলে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। এটাই দায়িত্বশীল সংসদীয় সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার পথে সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সংসদ শক্তিশালী হয় না; সরকারের ওপর কার্যকর নজরদারি এবং জনগণের স্বার্থে প্রশ্ন তোলার সক্ষমতাই সংসদের প্রকৃত শক্তি।

সংসদীয় কমিটিকে শক্তিশালী করার জন্য নিয়মিত বৈঠক, সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা, সরকারি সংস্থার জবাবদিহি, প্রতিবেদন প্রকাশ এবং কমিটির কার্যক্রমে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—ক্ষমতা যদি জনগণের কাছ থেকে আসে, তবে সেই ক্ষমতার হিসাবও জনগণের কাছেই দিতে হবে। সংসদীয় কমিটি সেই হিসাব চাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। তাই সংসদীয় কমিটি দুর্বল হওয়া মানে শুধু একটি সংসদীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা নয়; এটি গণতন্ত্রের জবাবদিহি কাঠামোকেই দুর্বল করে।

একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য তাই শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী সংসদ এবং কার্যকর সংসদীয় কমিটি। কারণ নজরদারি ছাড়া ক্ষমতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি জবাবদিহি ছাড়া গণতন্ত্রও অসম্পূর্ণ।