মশিউর রহমান মজুমদার: প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে কথা উঠলেই প্রথমে আসে রেমিট্যান্সের প্রসঙ্গ। অথচ একজন প্রবাসী শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো একজন মানুষ নন; তিনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক। দেশের বাইরে থেকেও তার নাগরিক অধিকার রয়েছে, রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং প্রয়োজনের সময় রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই প্রবাসীদের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কনস্যুলার সেবার বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সেবা আরও দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, যেসব বাংলাদেশি মিশনে ই-পাসপোর্ট সেবা চালু হয়েছে, সেখানে অনলাইনে আবেদন, সুবিধাজনক সময়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন এবং আবেদনের অগ্রগতি জানার সুযোগ রয়েছে। পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে আবেদনকারীকে এসএমএস বা ই-মেইলের মাধ্যমেও জানানো হয়। এগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেবা চালু হওয়া আর সেবা বাস্তবে সহজ হওয়া কি একই বিষয়?
বর্তমানে ১৭টি দেশে অবস্থিত ২৭টি বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের কার্যক্রম চালু রয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে ৪১টি দেশে এ সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও বিশ্বের সব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এনআইডি সেবা সমানভাবে সহজলভ্য হয়নি।
পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে আসে। বিদেশে বসবাসরত একজন বাংলাদেশির পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাকে সংশ্লিষ্ট মিশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনলাইনে আবেদন করা গেলেও বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে মিশনে উপস্থিত হতে হয়। আবার পাসপোর্ট ইস্যু করে ঢাকায় অবস্থিত ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। ফলে বিদেশস্থ মিশন ও ঢাকার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় কার্যকর না হলে আবেদনকারীর অপেক্ষার সময়ও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ নেওয়া যাক। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ই-পাসপোর্টের জন্য অনলাইনে আবেদন, ফি পরিশোধ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে এনআইডির জন্য অনলাইনে আবেদন ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা রয়েছে।
এটি ডিজিটাল সেবার দিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু একজন প্রবাসীর দৃষ্টিকোণ থেকে সেবার মান নির্ধারণ হবে শুধু ওয়েবসাইটে আবেদন করার সুযোগ আছে কি না, তা দিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন হলো—আবেদন থেকে সেবা পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা দ্রুত, নির্ভুল, পূর্বানুমানযোগ্য এবং হয়রানিমুক্ত?
একজন প্রবাসী যদি অনলাইনে আবেদন করার পরও তথ্য সংশোধন, নথি যাচাই, বায়োমেট্রিক, পাসপোর্ট সংগ্রহ কিংবা এনআইডির কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য বারবার দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যেতে বাধ্য হন, তাহলে ডিজিটাল সেবার মূল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হলো—এ প্রশ্ন থাকবেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের সমন্বয়। প্রবাসীদের পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, ভিসা, নথি সত্যায়নসহ বিভিন্ন সেবার সঙ্গে একাধিক সরকারি সংস্থা জড়িত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনার আওতায় পাসপোর্ট, ভিসা এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সনদের তথ্য যাচাই সহজ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে অনলাইন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখানেই ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী পরীক্ষাটি। শুধু অনলাইনে ফরম চালু করলেই ডিজিটাল সেবা সম্পূর্ণ হয় না। প্রয়োজন সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্যের আন্তঃসংযোগ, দ্রুত যাচাই, একবার তথ্য দিলে বারবার একই তথ্য জমা না দেওয়ার ব্যবস্থা এবং আবেদনকারীর জন্য স্পষ্ট জবাবদিহি।
এনআইডির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। একটি পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। ভোটার নিবন্ধন, ব্যাংকিং, সম্পত্তি, বিভিন্ন সরকারি সেবা কিংবা দেশে ফিরে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে এনআইডি প্রয়োজন হতে পারে। বিদেশে থাকা নাগরিকের এনআইডিতে ভুল থাকলে বা তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেটি সমাধানের প্রক্রিয়া কতটা সহজ—সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দূরত্ব। সব প্রবাসী রাজধানী বা বড় শহরের কাছাকাছি বসবাস করেন না। অনেক দেশে বাংলাদেশি নাগরিকরা শত শত মাইল দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করেন। তাই মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প একটি কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৬৩টি দেশে বাংলাদেশের ৮৬টি মিশন নিয়মিত মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প পরিচালনা করে। এসব ক্যাম্পে পাসপোর্টসহ বিভিন্ন কনস্যুলার সেবা দেওয়া হয় এবং দূতাবাস বা কনস্যুলেট থেকে দূরে থাকা প্রবাসীদের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে আগেই স্থান, সময় ও তারিখ জানানো হয়।
এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও নিয়মিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী বড় এবং ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত এলাকায় বসবাস করে, সেখানে নির্দিষ্ট বার্ষিক ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে মোবাইল কনস্যুলার সেবা পরিচালনা করা গেলে প্রবাসীদের সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচবে।
তবে শুধু সেবা পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার জানিয়েছে, প্রতিটি বাংলাদেশ মিশনে অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানে একটি প্রশ্ন অবশ্যই থাকতে পারে—একজন প্রবাসী অভিযোগ করার পর তিনি কত সময়ের মধ্যে উত্তর পাবেন? তার অভিযোগের অগ্রগতি কীভাবে জানতে পারবেন? কোনো সরকারি দপ্তরে তার আবেদন আটকে থাকলে কে তাকে জানাবে? এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না পেলে তিনি কার কাছে দায়বদ্ধতা চাইবেন?
প্রবাসী সেবার মান উন্নত করতে হলে এসব প্রশ্নের উত্তরকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। কারণ একজন প্রবাসী যখন একটি পাসপোর্ট নবায়ন করতে চান, এনআইডি করতে চান কিংবা একটি নথি সত্যায়ন করতে চান, তখন তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না। তিনি তার নাগরিক অধিকার অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সেবা চাইছেন।
সুতরাং প্রবাসী সেবাকে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। বিদেশে অবস্থান করলেও একজন বাংলাদেশি নাগরিক তার দেশের সঙ্গে প্রশাসনিক ও নাগরিক সম্পর্ক বজায় রাখেন। সেই সম্পর্ক যত বেশি সহজ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হবে, রাষ্ট্রের ওপর তার আস্থাও তত বেশি শক্তিশালী হবে।
এখানে আরও একটি মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা দেশের অর্থনীতির অংশীদার, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিও।
তাই পাসপোর্ট বা এনআইডি সেবার ক্ষেত্রে সামান্য একটি প্রশাসনিক জটিলতাও অনেক সময় একজন প্রবাসীর জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হতে পারে। দূতাবাসে যেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়া, যাতায়াতে অর্থ ব্যয় করা কিংবা একটি সাধারণ সমস্যার সমাধানে বারবার যোগাযোগ করা—এসবের প্রতিটি বিষয়ই প্রবাসীর কাছে বাস্তব ব্যয়।
সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো তাই বাস্তব ফলাফলে রূপ নেওয়া জরুরি। অনলাইন আবেদন, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, আবেদন অনুসরণের ব্যবস্থা, ই-অ্যাপোস্টিল, অনলাইন অভিযোগ এবং মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প—সবগুলো উদ্যোগকে একটি সমন্বিত সেবা কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেবার মান পরিমাপ করতে হবে প্রবাসীর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। কতটি আবেদন নেওয়া হয়েছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তি হয়েছে। কতটি মিশনে সেবা চালু হয়েছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কতজন নাগরিক বাস্তবে সেই সেবা সহজে পেয়েছেন।
প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্ট ও এনআইডি সেবা যদি সত্যিই দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা যায়, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক সংস্কার হবে না; এটি রাষ্ট্র ও প্রবাসীর সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। প্রবাসীরা দেশের জন্য অর্থ পাঠান। কিন্তু তাদের কাছ থেকে শুধু অর্থ নয়, আস্থাও পাওয়া প্রয়োজন। আর সেই আস্থা তৈরি হয় প্রতিশ্রুতিতে নয়—বাস্তব সেবায়। তাই এখন সময় এসেছে প্রশ্নটি আরও সরাসরি করার—প্রবাসীর পাসপোর্ট-এনআইডি সেবায় আমরা কতটা এগিয়েছি, আর প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবে পৌঁছেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নয়; রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীর অর্থ যেমন দেশের সম্পদ, তেমনি প্রবাসীর আস্থাও জাতীয় সম্পদ। সেই আস্থা রক্ষা করতে হলে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব সেবার মানও নিশ্চিত করতে হবে।
— সাংবাদিক, জ্যাকসন হাইটস, নিউ ইয়র্ক।