রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নিতে আইএইএএর সহায়তা চাইল বাংলাদেশ

ঢাকা — রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সহযোগিতা চেয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বৃহস্পতিবার অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আইএইএর সদর দপ্তরে সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির সঙ্গে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এ সহযোগিতা চান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ফকির মাহবুব আনাম। এতে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে সংস্থাটির ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান মন্ত্রী।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও আইএইএর পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। ফকির মাহবুব আনাম বলেন, স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য, পানি ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আইএইএর কারিগরি সহযোগিতা থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি ২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য দেশভিত্তিক কর্মসূচি কাঠামো (সিপিএফ) স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে আগামী বছরগুলোতে কারিগরি সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে জ্বালানি সংযোজনের মাধ্যমে কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, এর ফলে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তাসংক্রান্ত যৌথ সনদে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টিও বৈঠকে তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। বৈঠকে ‘রশ্মির আশা: সবার জন্য ক্যানসার চিকিৎসা’ (রেজ অব হোপ) উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়। এ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে আইএইএর মহাপরিচালক ও সংস্থাটির সচিবালয়ের নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান ফকির মাহবুব আনাম।

বাংলাদেশ ২০২৫ সালে এ উদ্যোগে যুক্ত হয় এবং জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ দিতে আইএইএর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, এ উদ্যোগের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সমন্বিত একক সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আরও সমন্বিত, সহজলভ্য ও রোগীকেন্দ্রিক ক্যানসার চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে। বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দক্ষতা উন্নয়ন, জ্ঞান বিনিময় এবং কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আইএইএর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফকির মাহবুব আনাম ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ আরও সম্প্রসারণে ‘রশ্মির আশা’ উদ্যোগের আওতায় সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে আইএইএ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ প্রভাব মূল্যায়ন মিশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বাস্তবভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন এবং ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণে এ মিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণেও অবদান রাখতে হবে। তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

শিক্ষার্থী, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বৃত্তি এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ আরও সম্প্রসারণে আইএইএর মহাপরিচালকের প্রতি আহ্বান জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো আরও সমন্বিত, ন্যায়সংগত ও টেকসই ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল মানুষের প্রয়োজনের জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।

বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, ভিয়েনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি তৌফিক হাসান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মঈনুল ইসলাম এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।