বিদেশি সহায়তার বদলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে জোর দেওয়ার আহ্বান ল্যান্ডাউয়ের

শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বিদেশি সহায়তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার পরিবর্তে বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে কূটনীতির কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২৫ সেপ্টেম্বর ‘ট্রেড ওভার এইড ডিলস শোকেস’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ল্যান্ডাউ বলেন, কয়েক দশক ধরে কূটনীতির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলো অনেকটা পিছিয়ে ছিল। রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি জনগণের সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ল্যান্ডাউ বলেন, অর্থনৈতিক প্রকল্প এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যা কোনো নির্দিষ্ট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টিকে থাকে। তার মতে, বিদেশি সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে কোনো দেশকে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা করতে পারে; তবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রকল্প অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগের ফলে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়—এমন ধারণার সঙ্গেও তিনি ভিন্নমত পোষণ করেন। ল্যান্ডাউ বলেন, বিনিয়োগের শর্ত ও কাঠামো সরকারগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে, যাতে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট দেশ উভয় পক্ষই তাদের দায়িত্ব, শর্ত ও সম্ভাব্য লাভ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির একটি ইঞ্জিন।’ তার মতে, বিদেশি পুঁজি একটি দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের বিনিয়োগ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও শক্তিশালী করতে পারে।

বিদেশে মার্কিন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ

ল্যান্ডাউ বলেন, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার অন্যতম দায়িত্ব হলো মার্কিন সরকার ও বিদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরও কার্যকর করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায়ই তিনি শুনতে পান—বিদেশি কোনো প্রকল্পে অন্য দেশের কোম্পানিগুলো একাধিক দরপত্র জমা দিলেও মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কোনো প্রস্তাব পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, আগে বিদেশে মার্কিন ব্যবসার প্রসঙ্গ উঠলে তিনি মূলত নির্মাণ, অবকাঠামো, তেল, খনি ও অন্যান্য সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর কথা ভাবতেন। তবে এখন তিনি মার্কিন পুঁজির ভূমিকার ওপরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ল্যান্ডাউ বিশেষভাবে নিউইয়র্ক সিটির আর্থিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বলেন, এখানে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ পুঁজি রয়েছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তার মতে, কোনো দেশের বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে পুঁজির মালিকদের আগ্রহ তৈরি হলে তারা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের পথও তৈরি করতে পারেন।

মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর জোর

ল্যান্ডাউ বলেন, বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের কাজ করার পদ্ধতিতে কিছুটা বিভাজন রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় প্রকল্পে মার্কিন সরকারের সম্পৃক্ততা চান, যাতে কোনো দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন বা পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগের শর্ত পরিবর্তনের ঝুঁকি কমে। তিনি বলেন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কমার্স ডিপার্টমেন্ট, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (EXIM), ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (DFC) এবং মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ল্যান্ডাউ বলেন, এসব সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহযোগিতা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করে একটি ‘ওয়ান-স্টপ শপ’ ব্যবস্থায় পরিণত করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে বিনিয়োগের সম্ভাবনা

ল্যান্ডাউ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জকে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে এবং আরও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে হনুলুলুতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলোর নেতাদের নিয়ে একটি ব্যবসা সম্মেলন ও বিনিয়োগ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আগ্রহের খাতগুলো চিহ্নিত করে মার্কিন বেসরকারি খাত ও পুঁজির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ল্যান্ডাউ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দায়িত্ব হলো সেই আগ্রহকে সংশ্লিষ্ট দেশ ও বিনিয়োগের সুযোগের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা।

যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বিশ্বব্যাপী মার্কিন বেসরকারি খাতের কার্যক্রম সম্প্রসারণে তার ব্যক্তিগত ও প্রশাসনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে মার্কিন বেসরকারি খাতের জন্য একটি ‘অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ’ তৈরিতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।