আব্বাসকে ভিসা না দেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্তে গভীর দুঃখ জাতিসংঘ মহাসচিবের

শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক: ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসকে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মার্কিন সিদ্ধান্তের কারণে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আব্বাসের সরাসরি অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে শুরু হতে যাওয়া সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে মাহমুদ আব্বাসসহ কয়েকজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে ভিসা দেওয়া হবে না। ফলে অধিবেশনে ফিলিস্তিনের পক্ষে জাতিসংঘে দেশটির মিশনের সদস্যরাই সরাসরি অংশ নিতে পারবেন।

ডুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে জাতিসংঘের কার্যক্রমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণের সক্ষমতার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে মহাসচিব উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সব প্রতিনিধিদলের পূর্ণ অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সব প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান ডুজারিক।

গত বছরও ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা দেয়নি। সে সময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিয়মিত অংশ নেওয়া আব্বাসকে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দিতে হয়েছিল। চলতি বছরও তাঁর সরাসরি উপস্থিতি সম্ভব না হওয়ায় ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদে আব্বাসকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার অনুমোদনের পক্ষে ১৫২টি দেশ ভোট দেয়, বিপক্ষে ভোট পড়ে তিনটি। এর ফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরাষ্ট্র তাঁর ভার্চুয়াল অংশগ্রহণের পক্ষে অবস্থান নেয়।

ভিসা না দেওয়ার কারণ

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) ও ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) তাদের কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে ওয়াশিংটন মনে করে। এর মধ্যে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের বিষয়টি উল্লেখ করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

ওয়াশিংটনের অভিযোগের মধ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের এমন একটি পুরোনো ব্যবস্থা নিয়েও আপত্তি রয়েছে, যার আওতায় কারাগারে থাকা বা নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ব্যক্তির মধ্যে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত ব্যক্তিরাও ছিলেন।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অবশ্য ওই ব্যবস্থা সংস্কার করেছে। নতুন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক পরিচয় বা কেউ কারাগারে ছিলেন কি না—এসবের পরিবর্তে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরও বলেছে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মোকাবিলার ফিলিস্তিনি উদ্যোগ এবং ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টার সঙ্গে ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বর্তমান ভিসা নীতিতেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা বা অনুমোদিত ভ্রমণ নথি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ভিসা প্রদানে ব্যাপক বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে বলে দপ্তরটি জানিয়েছে।

পশ্চিম তীরে সহিংসতা

আব্বাসকে ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি সেনা ও বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর পশ্চিম তীরেও সহিংসতা বেড়েছে। একই সময় গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতিস্থাপনকারীদের হাতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে যোদ্ধা ও বেসামরিক উভয়েই রয়েছেন।

অন্যদিকে, ৭ অক্টোবরের হামলায় ইসরাইলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। এর জবাবে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরু হয়, যাতে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হামাস-নিয়ন্ত্রিত হলেও জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে এর হতাহতের পরিসংখ্যানকে সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

এদিকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের যেকোনো ধরনের একতরফা সংযুক্তিকরণের (অ্যানেক্সেশন) বিরোধিতা করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধানে আলোচনার ওপর জোর দিয়ে আসছে।